ট্রান্সক্রাইবিংয়ের মাধ্যমে আয়ের আদ্যোপান্ত

অনলাইনে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই ঘরে বসে বিচিত্র কাজের মাধ্যমে সারা বিশ্বের অনেক তরুণ-তরুণী তাদের উপার্জনের পথ সৃষ্টি করে নিয়েছে। ইন্টারনেটের বিস্তার যত বাড়ছে এই সংখ্যাও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে কেবল একটি কম্পিউটার এবং একটু ভাল ইন্টারনেট থাকলেই এখন বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তের যেকোনো কাজ করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। আপনার যদি কোনো কাজে দক্ষতা থেকে থাকে, সেই দক্ষতা কাজে লাগানো এবং সঠিক মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এই ইন্টারনেট।

আপনি ভাল গ্রাফিক্স ডিজাইন করতে পারেন? আপনার কাজের অনেক সুযোগ আছে ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটগুলোতে। ভাল ছবি তুলতে পারেন? ওয়েবসাইট বানাতে পারেন? আপনারও কাজ করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ আছে। এমনকি আপনি যদি ভাল রান্নাও করতে পারেন, সেটা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন রান্নার রেসিপির ইউটিউব ভিডিও বানিয়েও আপনি উপার্জন করতে পারেন।

অডিও বা ভিডিও বার্তাকে লেখায় পরিণত করে আয় করতে পারবেন অর্থ; image source: wordclerks.com

এমনকি যেকোনো অডিও বা ভিডিও ফাইল শুনে সেটা লিখে সংরক্ষণ করার মাধ্যমেও আপনি আয় করতে পারেন। জ্বি হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। সারা বিশ্বব্যাপী এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা এসব অডিও ভিডিও ফাইলের তথ্য লিখে সংরক্ষণ করার জন্য আপনাকে অর্থ দেবে। আর এই কাজগুলো আপনি ঘরে বসেই অনলাইনে করতে পারবেন। এই কাজটিকে বলা হয় ট্রান্সক্রাইবিং। আর আপনি যদি কাজটি করে শুরু করেন তাহলে আপনি হবেন একজন ট্রান্সক্রাইবার বা ট্রান্সক্রিপশনিস্ট।

ট্রান্সক্রাইবিং কী?

সারা পৃথিবীব্যাপী অনেক তথ্য ভিডিও এবং অডিও ফরম্যাটে রয়ে গেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার, কারো ভাষণ, কথোপকথন রয়ে গেছে ভিডিও বা অডিও ফরম্যাটে। কিন্তু এগুলো লিখিত থাকাও প্রয়োজনীয়। অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের এসব ফরম্যাটে থাকা তথ্যকে লিখিত ফরম্যাটেও সংরক্ষণ করতে চান। তখনই সামনে চলে আসে ট্রান্সক্রাইবিং শব্দটি

অডিও, ভিডিও ফরম্যাটে সংরক্ষিত তথ্যগুলো শুনে শুনে সেগুলোকে লিখিত ফরম্যাটে পরিণত করার কাজটিই হলো ট্রান্সক্রাইবিং। আর যে পেশাদার ব্যক্তিটি এই কাজটি সম্পন্ন করে থাকে তাকে বলা হয় ট্রান্সক্রাইবার।

কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং ইংরেজিতে দক্ষতা প্রয়োজনীয়; image source: akorbi.com

ট্রান্সক্রাইবিং এর জন্য কী কী প্রয়োজনীয়?

তেমন কিছুই নয়; তবে একজন ভাল ট্রান্সক্রাইবার হওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই খুব উচ্চমানের টাইপিস্ট হতে হবে। দ্রুত টাইপ করার দক্ষতা ট্রান্সক্রাইবার হিসেবে আপনার চাহিদা বা মান দুটোই বৃদ্ধি করবে। এর সাথে সাথে ইংরেজিতে খুব দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। কেননা, যেসব ট্রান্সক্রাইবিংয়ের কাজ আপনি পাবেন সেগুলোর অধিকাংশই হবে ইংরেজিতে।

সাথে সাথে অন্যান্য ভাষা জানা থাকলে ভিন্ন ভাষার ট্রান্সক্রাইবিংয়ের কাজও আপনি নিতে পারবেন। তবে ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ায় সকল ডকুমেন্টই এখন ইংরেজিতে লিখে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে ইংরেজিতে দক্ষতা আপনাকে ট্রান্সক্রাইবিং এর মাধ্যমে আয় করতে সহায়তা করবে। আর অন্যান্য অনলাইন আয়ের ক্ষেত্রের মতো এখানেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

ট্রান্সক্রাইবারদের কাজের ক্ষেত্র কোনগুলো?

পেশাদার ট্রান্সক্রাইবাররা কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করে আয় করতে পারে। এখানে ক্ষেত্র বলতে যেসব কাজগুলোতে ট্রান্সক্রাইবিং প্রয়োজন হয় সেগুলো বোঝানো হচ্ছে। সাধারণত তিনটি ক্ষেত্রে ট্রান্সক্রাইবারের কাজের সুযোগ রয়েছে।

লিগ্যাল: বিভিন্ন মামলার শুনানি ট্রান্সক্রাইব করার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে ট্রান্সক্রাইবাররা তাদের পাঠানো অডিও ফাইল শুনে শুনে সেগুলোর লিখিত রূপ দেয়। এছাড়া বিভিন্ন ইন্টারভিউ এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদও ট্রান্সক্রাইবারদের কাজের লিগ্যাল ক্ষেত্রের মধ্যেই পড়ে।

মেডিক্যাল: ডাক্তারের নোট, রোগের বিবরণ, রোগী এবং ডাক্তারের সাক্ষাৎকার, ডাক্তারের পরামর্শ ট্রান্সক্রাইব করার প্রয়োজন হয়।

এন্টারটেইনমেইন্ট: বিভিন্ন ইউটিব ভিডিও, গান, সিনেমার ডায়ালগ, রেডিও এবং টেলিভিশনে প্রচারিত খবরের ট্রান্সক্রাইব করার প্রয়োজন হয়।

বছরে আয় করতে পারবেন ৩০-৪০ হাজার ডলার; image source: lexjobs.com

ট্রান্সক্রাইবিং এর মাধ্যমে কেমন আয় করা সম্ভব?

ট্রান্সক্রাইবিং জগতে আপনার আয় নির্ভর করবে ট্রান্সক্রাইবার হিসেবে আপনি কতটা দক্ষ সেটার ওপর। আপনি কত দ্রুত টাইপ করতে পারেন, একটি বাজে মানের অডিও-ভিডিও ফাইল থেকে কত সুন্দরভাবে তথ্য বের করে আনতে পারেন, আপনার ইংরেজির দক্ষতা কেমন- এসব বিষয়ের ওপরে আপনার আয় নির্ভর করবে। তবে সাধারণত একজন ট্রান্সক্রাইবার শব্দপ্রতি .৫ থেকে .৭ সেন্ট আয় করতে পারেন। তবে কোনো ট্রান্সক্রাইবার যদি সপ্তাহে অন্তত ৪০ ঘন্টা কাজ করে থাকেন তাহলে বছরে তার উপার্জন ৩০ থেকে ৪০ হাজার ডলারও হতে পারে।

আপনি যত বেশি অডিও ভিডিও ফাইলকে লিখিত রূপে সংরক্ষণ করবেন আপনার আয় তত বাড়বে। এক্ষেত্রে তাই আপনার আয়ের সুযোগ পুরোপুরিই আপনার ওপর নির্ভর করছে। আবার ট্রাইন্সক্রাইবিংকে আপনি আপনার বাড়তি কাজ হিসেবেও নিতে পারেন। স্বাভাবিক চাকরির পাশাপাশি আপনার যদি বাড়তি সময় থাকে তাহলে সে সময়টি আপনি ট্রান্সক্রাইবার হিসেবে কাজ করে বাড়তি উপারজন করতে পারবেন।

আপনি যদি ট্রান্সক্রাইবার হিসেবে কাজ শুরু করতে চান তাহলে প্রথমদিকে আপনার আয় কিছুটা কম হবে। কেননা এই কাজটিতে আপনার অভিজ্ঞতা যত বেশি, আপনার চাহিদাও তত বেশি। তাই শুরুতে কম আয় হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

ট্রান্সক্রাইবিং এর কাজ পাওয়া যাবে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে; image source: thewirecutter.com

কোথায় পাবেন ট্রান্সক্রাইবিং এর কাজ?

অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ট্রান্সক্রাইবিং এর অনেক কাজের সুযোগ রয়েছে। এসব সাইটগুলোতে ক্রেতারা তাদের কাঙ্ক্ষিত ট্রান্সক্রাইবারদের খুঁজে নেয়। আবার সাইটগুলো নিজেরাও ট্রান্সক্রাইবের কাজের অফার দেয়। তবে এসব ওয়েবসাইট থেকে ট্রান্সক্রাইব করার সুযোগ পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই তাদের সদস্য হতে হবে।

এজন্য তারা আপনাকে একটি ছোট ট্রান্সক্রাইবিং পরীক্ষাও নেবে। পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল তারা আপনাকে কাজ দেয়ার জন্য অপেক্ষমান তালিকায় রাখবে। ট্রান্সক্রাইবিং এর কাজ পাওয়া যায় এমন কয়েকটি ওয়েবসাইটের নাম হলো: ট্রান্সক্রাইবমি, ট্রান্সক্রাইব এনিহয়ার, কুইকট্যাট, রেভ, টাইগার ফিশ, ক্রাউডসার্ফ ইত্যাদি।

Written by Sizan Ahmed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সফল অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার হওয়ার পাঁচটি উপায়

দক্ষ কন্টেন্ট রাইটারের যে পাঁচটি গুণ থাকা আবশ্যক