সোশ্যাল মিডিয়াতে ‘বেচাকেনাবিহীন’ ব্যবসার আদ্যোপান্ত

পণ্য ছাড়াই আয় করুন সোশ্যাল মিডিয়াতে। সোর্সঃ Jokerwebhosting.com

সারাদিনে আমরা সবাই ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদির পেছনে কম-বেশি সময় ব্যয় করি।  অনেকেরই এইসকল প্ল্যাটফর্মে শতাধিক বন্ধু আর হাজারো ফলোয়ার রয়েছে। অনেকেই এ ব্যাপারটিকে অদেখাভাবে রেখে দেয়। কিন্তু এই বন্ধু/ফলোয়াররাই করে দিতে পারে আপনার উপার্জনের পথ। অনেকেই ভাবে যে কেবল সরাসরি পণ্য বিপণন এই মাধ্যমের একমাত্র উপার্জনের পথ। কিন্তু পণ্য বেচাকেনা ছাড়াও কেবল নিজের জীবনধারার একটি সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির মাধ্যমেও উপার্জন সম্ভব। একে বলে ‘ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং’।

এই পন্থায় মার্কেটিং হলো পুরানো এবং নতুন বিপণন সরঞ্জামগুলোকে সেলিব্রিটির পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এবং আধুনিক কন্টেন্ট-চালিত বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচারণা চালানো। কিন্তু এক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েন্সার কোন অভিনেতা অভিনেত্রী হতে হবে তা নয়, এখানে পরিচিত ও পরিসরই একমাত্র চাবিকাঠি। সনাতন সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ ব্যবহারকারী, যে কেউই এই কাজে নেমে যেতে পারে।

ইনফ্লুয়েন্স মার্কেটিং মূলত দুটি নিয়ম মেনে করা উচিত। প্রথমত, গুছিয়ে, কৌশল খাটিয়ে, পরিকল্পনা এবং ব্যয় হিসেব করে কাজ করা। দ্বিতীয়ত, ঠান্ডা মাথায় এবং মানবিকভাবে সবার সাথে সাধারণ মানুষের মত অংশগ্রহণ করা। এটি কোনো কর্পোরেট ধাঁচের বিজ্ঞাপন পদ্ধতি নয়। একে যত সাধারণ করা যায় ততই লাভ।

প্ল্যাটফর্ম

শুরু করতে পারবেন কেবল একলাই । সোর্সঃ Shutterstock.com

কোথায় নিজেকে প্রচার করলে সবচেয়ে বেশি উপার্জন করা যায় সেটা চলতি ট্রেন্ড এবং প্রসারের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফেসবুক এবং ইন্সটাগ্রামে সবচেয়ে বেশি ইউজার রয়েছে। কিন্তু বাইরের দেশে মূলত ইন্সটাগ্রামকেই বলা হয় ইনফ্লুয়েন্সারদের আবাসস্থল। এছাড়াও, বয়স, আচরণ, ধ্যানধারণা ইত্যাদি সম্পর্কেও গবেষণা করতে হবে।

যেমন, ফেসবুকে বর্তমানে ২০ বা তদোর্ধ্ব বয়সের মানুষদের বিচরণ দেখা যায়। অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম স্ন্যাপচ্যাটে কিশোর ও তরুণদের আনাগোনা দেখা যায়। এসকল ধারণা রাখা এজন্য প্রয়োজন যাতে নিজে প্রচারগুলো আকাঙ্ক্ষিত দর্শকদের কাছে পৌঁছায়। মূলত ইনস্টাগ্রামে থাকা সুবিধাগুলো ব্যক্তিগত প্রচারকে প্রাধান্য দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন সাইটে থাকা নিজের প্রোফাইল গুলো নিজস্ব ব্র্যান্ডিং এবং পরিসরকে বৃদ্ধি করার একটি মাধ্যম হিসেবে ধরা যায়।

নিজের প্রচার একটিমাত্র প্লাটফর্মে সীমিত থাকলে সেটা কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে ‘ভাইন’ নামক একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ভিত্তিক সোশ্যাল প্লাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়ার পর অনেক ইনফ্লুয়েন্সার ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামে নিজেদের প্রচার শুরু করে। তাই, সবার উচিত নিজেদের প্রচার যথাসম্ভব মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম করা।

এঙ্গেজমেন্ট

কোন ব্র্যান্ড, সনাতন বিজ্ঞাপন ছেড়ে আপনার কাছে আসার কারণ হবে কেবল একটি ব্যাপার, এঙ্গেজমেন্ট। সাধারণ বিজ্ঞাপনে মূলত এঙ্গেজমেন্ট হয় একপাক্ষিক। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে এটি অনেকটাই দ্বিপাক্ষিক। তাই নিজের অনুসারীদের সাথে এঙ্গেজমেন্ট সেটা যত বৃদ্ধি করা যায় ততই লাভ।

নিজেকে সবসময় আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করলে ব্র্যান্ডগুলো আরো উৎসাহিত হবে আপনার সাথে কাজ করতে। আরেকটি ব্যাপার হলো সময়। সময় নিয়ে আপনার গ্রাহকদের প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর দিন। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রসার সম্ভব। এক্ষেত্রে কমেন্টের প্রতিউত্তর দেওয়া আপনার দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়। এই কাজ যত সহজ মনে হয়, তত সহজ নয়। আপনার ফলোয়ার দের সাথে এঙ্গেজমেন্ট একটি একান্ত আপন সম্পর্ক সৃষ্টি করবে। আর এই সম্পর্কটি আপনার ব্যবসাকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে। এটি আপনাকে সনাতন বিজ্ঞাপন থেকে আলাদা করবে।

বিনামূল্যে পণ্য বিতরণ

আপনার ফলোয়ার হচ্ছে আপনার গ্রাহক। সোর্সঃ Advertisingweek360.com

সবারই বিনামূল্যে পণ্য পাওয়ার প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তাই নিজের সাথে গ্রাহকদের এঙ্গেজমেন্ট অটুট রাখতে মাঝেমধ্যেই ব্র্যান্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় বিনামূল্যে পণ্য বিতরণ করুন। এটি করতে পাড়েন লটারি পদ্ধতিতে কিংবা পছন্দের কোনো ফ্যানকে উপহার দেয়ার মাধ্যমে। অবশ্য এটা খুবই নিজস্ব ব্যাপার। অনেকেই এই ফ্রি গিফট দেওয়া অপছন্দ করতে পারে। নিজে এবং নিজের ফলোয়ারদের কথা চিন্তা করে সে অনুযায়ী কাজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজেকে স্প্যাম হওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

উপযুক্ত শ্রোতা

একজন ইনফ্লুয়েন্সর হিসেবে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে তার উপযুক্ত শ্রোতা খুঁজে বের করা। একজন অভিনেত্রী যেরকম একপ্রকার ফলোয়ার বেইজ তৈরি করে, সেটার সাথে একজন জিম কোচের ফলোয়ার বেইজ একরকম হওয়ার সম্ভাবনা কম। নিজের পছন্দ, পেশা, অভ্যাস ইত্যাদির প্রভাবে কোন রকম ফলোয়ার তৈরি হচ্ছে তা একটি বড় ব্যাপার। নিজে একজন জিমার হয়ে কোন ফাস্টফুড ব্র্যান্ডের সাথে প্রচারণা করলে তা হয়তো ফলোয়ারদের অপছন্দ হতে পারে। এবং সে অপছন্দ হওয়া আপনার প্রসারকে নিমজ্জিত  করে ফেলতে পারে। অবশ্যই উচিত নিজের উপযুক্ত শ্রোতা খুঁজে বের করা এবং উপযুক্ত শ্রোতার সাথে মিলিয়ে উপযুক্ত ব্র্যান্ড গুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এই মার্কেটিং ব্যবস্থায় কোনকিছুই তাড়াহুড়ো করে করা সম্ভব না। তাই ভেবে চিন্তে কাজ করাই শ্রেয়।

মূল্য নির্ধারণ এবং উচ্চমানের পোস্ট

ব্র্যান্ডের সাথে চুক্তির মাধ্যমে কেবল সোশ্যাল মিডিয়া দিতেই উপার্জন সম্ভব। সোর্সঃ Socialhackettes.com

একজন ইনফ্লুয়েন্সার  হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের মূল্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ব্যবস্থায় উপার্জন মূলত আসে পৃষ্ঠপোষকদের মাধ্যমে। কখনোই ফ্রি প্রোডাক্ট হিসেবে কোনো ব্র্যান্ডের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া উচিত না। নিজের প্রচার এবং প্রসার বিবেচনা করে তার সাথে মিলিয়ে এক বা একাধিক ব্র্যান্ডের সাথে নিজেকে চুক্তিবদ্ধ করার মাধ্যমে একটি ভালো উপার্জন সম্ভব।

অনেক ব্র্যান্ড প্রত্যেকটি সোশ্যাল মিডিয়া পোষ্টের জন্য ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে। তাদের এই ব্যয়ের সাথে মিলিয়ে উচ্চ মানের পোস্ট তৈরি করা একজন ইনফ্লুয়েন্সারের অদ্বিতীয় দায়িত্ব। একটি ব্র্যান্ড তখনই আপনার সাথে কাজ করতে যাবে যখন আপনার পোস্টগুলো যথেষ্ট মানসম্পন্ন হবে। বিশেষকরে, মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে মানসম্পন্ন ফটোগ্রাফির উপর। কথায় আছে, একটি ছবি হাজার শব্দ প্রকাশ করে। মনে রাখবেন, আপনার পোস্টে কেবল আপনি নিজেকে তুলে ধরছেন না, বরং একটি ব্র্যান্ড আপনার সাথে নিজেকে তুলে ধরতে চাচ্ছে।

স্বচ্ছতা

ইনফ্লুয়েন্সার ব্যবসায় আপনি হলেন ব্র্যান্ড ও গ্রাহকের মাঝে সংযোগ তৈরির সেতু। অবশ্যই এ ব্যাপারটি নিয়ে স্বচ্ছ থাকা উচিত। আপনি গেরিলা মার্কেটিং করছেন না। তাই কোন ব্র্যান্ড আপনার সাথে চুক্তিবদ্ধ সে ব্যাপারটি গোপন করা চলবে না। এছাড়াও যদি ব্র্যান্ড আপনার নিজস্ব হয়, সেটিও সবার কাছে স্বচ্ছ রাখা উচিত। এটি মূলত গ্রাহকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাইয়ে দেয়।

বর্তমানে অনেকেই বলে থাকে, বাজার নাকি ফেসবুকে এসে বসেছে। একথা আসলে অস্বীকার করার উপায়ও নেই। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, এগুলো হচ্ছে বর্তমানে সোনার খনি। এসকল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারছে। আর এই যোগাযোগ ব্যবস্থার মাঝে তৈরি হয়েছে এক প্রকার সক্রিয় বিজ্ঞাপনের সুযোগ। তাই, একটু সময় ও চেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব একটা নির্ভরযোগ্য উপার্জনের পথ তৈরি করা।

ফিচার ছবি- socialmediaexplorer.com

ওয়েবসাইট মানিটাইজেশনের কার্যকর কিছু উপায়

সফল ইউটিউবার হবার মূলমন্ত্র