সফল ইউটিউবার হবার মূলমন্ত্র

২০০৫ সালের আগে আপনার জীবনটা কল্পনা করে দেখুন তো। কোনো গান পছন্দ হয়ে গেলে তা বারেবারে শুনতে পুরো অ্যালবামটিকে কিনতে হতো কিংবা পত্রিকায় ছাপা কোনো রান্নার রেসিপি সংগ্রহ করছেন, হঠাৎ করে খাতাটি হারিয়ে গেল! হয়তো আপনার আছে কোনো গুণ যা আপনি বিশ্বকে জানাতে চান কিন্তু উপযুক্ত কোনো প্রচারমাধ্যম খুঁজে না পাওয়ায় আপনার সে প্রতিভা লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে থাকলো। হতে চান পরিচালক কিন্তু আপনার নেই কোনো ফান্ডিং ফলে সিনেমাটি  দর্শকদের  দেখাতে পারছেন না। তবে ২০১৯ সালে এসে কথাগুলো সম্পূর্ণ কল্পনাতীত মনে হবে। কেননা কিশোর থেকে যুবক কিংবা বৃদ্ধ,  সকলেই ভিডিও ব্লগিং সংস্কৃতির সাথে পরিচিত। এই সংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় উপকরণ হলো ইউটিউব।

ইউটিউব  একটি ওয়েবসাইট যেখানে আপনি  ভিডিও আদান-প্রদান করতে পারবেন, দেখতে পারবেন, নিজস্ব চ্যানেল খুলতে পারবেন। আর এসবই করা যায় সামান্য কিছু এমবি (মেগাবাইট) খরচ করে।  ইউটিউব বিনোদনের একটি মাধ্যম এবং একই সাথে এর মাধ্যমে নিজের প্রতিভা প্রদর্শন করে যেকোনো ব্যক্তি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। এমনকি ইউটিউবকে ব্যবহার করে জনপ্রিয় ইউটিউবারেরা অর্থ উপার্জন করে থাকেন।

আপনি যে বিষয়ে দক্ষ তা ভিডিও করে ইউটিউবে ছেড়ে দিলেই যে আপনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠবেন এবং আপনার ব্যাংকে ডলার জমতে থাকবে ব্যাপারটি সেরকম নয়। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, নিম্নমানের ভিডিও সম্পাদনা, ভিডিওর বিষয়বস্তুর উপযোগিতার অভাব, ভিডিওর আকর্ষণীয় নাম না থাকা অথবা বিবরণ না দেওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ইউটিউবারদের ভিডিও জনপ্রিয়তা পায় না। তবে ব্যাতিক্রম ঘটনাও ঘটে থাকে। অনেক ভিডিও অপ্রত্যাশিতভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। যেমন- বিড়ালের অঙ্গভঙ্গি অথবা ব্লেন্ডারের সাহায্যে মোবাইলফোন গুঁড়ো করার(!) মতো সব অদ্ভুত বিষয় নিয়ে তৈরি ভিডিও কোনো কোনো সময় ভাইরাল হয়েছিল।

ইউটিউব ব্যবহারে কেউই পিছিয়ে নেই; ইমেজ সোর্স: nytimes.com

সুতরাং, ফলোয়ার সংখ্যা নিয়মিত বৃদ্ধি করতে চাইলে ইউটিউবারকে  কিছু কৌশল অবলম্বন করে চলতে হবে। নিজের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ইউটিউবে ভিডিও ব্লগিং করে জনপ্রিয়তা লাভ করা যায়, তবে এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল।  নিম্নে কিছু কার্যকরী পরামর্শ দেয়া হলো যা কাজে লাগিয়ে আপনিও একটি সফল ইউটিউব চ্যানেলের মালিক হতে পারবেন।

১. ভিডিওর বিষয়বস্তু নির্ধারণ করুন

কোনো ভিডিও তৈরীর আগে এর বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু তাই না আপনার ইউটিউব চ্যানেলটি সক্রিয় রাখতে ভিডিওর বিষয়বস্তু চমকপ্রদ এবং চিত্তাকর্ষক হতে হবে। এই ধারা বজায় রাখলে অনুসারীর সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি ভিডিওর ভিউ বাড়বে। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে ভিডিওর বিষয়বস্তু এমন হতে হবে যেন তা দর্শককে সম্পূর্ণ ভিডিও দেখতে বাধ্য করে। অনেক সফল ইউটিউবারেরা তাদের ভিডিওগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট বিষয় মেনে চলে, যেমন- কেউ শুধুমাত্র ভ্রমণ সম্পর্কে ভিডিও তৈরি করে, তো আবার কেউ তাদের দৈনন্দিন জীবনকে ভিডিওর মাধ্যমে প্রদর্শন করে থাকে। অর্থাৎ একটি বিষয়কে মুলে রেখে তারা তাদের ভিডিওর বিষয়বস্তু তৈরি করে থাকে।

২. সাধ্যের মধ্যে থেকে শ্রেষ্ঠ উপকরণটি বাছুন

ইউটিউবের মাধ্যমে নিজের প্রতিভাকে ছড়িয়ে দিন; ইমেজ সোর্স: developers.google.com

আপনি একটি ভিডিও তৈরি করলেন যেটার বিষয়বস্তু সহজেই দর্শকদের মনকে ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা বাধলো এর উপস্থাপনা নিয়ে। সুরের থেকে নাদ বেশি, কোথাও অন্ধকার তো কোথাও আলো, ক্যামেরা ফোকাস করতে পারছে না ইত্যাদি। ফলে আপনার চমৎকার কাজটি পন্ডশ্রমে পরিণত হতে পারে। সদ্য ভিডিও  ব্লগিংয়ের  দুনিয়ায় পা রাখা ইউটিউবারেরা সাধারণত তাদের স্মার্টফোনটিকে ভিডিও ধারণে কাজে লাগায়। কিন্তু আপনার লক্ষ্য যদি বিনোদন দেয়ার থেকে বেশি কিছু হয়ে থাকে তবে অবশ্যই উপযুক্ত উপকরণটি বাছাই করে নিতে হবে।

উন্নতমাণের ভিডিও ধারণের যন্ত্র আপনার ভিডিওর মাণ উন্নত করবে; ইমেজ সোর্স:

বেশিরভাগ ইউটিউবারেরা ডিএসএলআর কিংবা মিররলেস ক্যামেরার সাহায্যে ভিডিও করে থাকে। ভিডিওগ্রাফির জন্য তাদের কেউ কেউ ট্রাইপড, উন্নত মানের লেন্স এবং স্টুডিও লাইট ব্যবহার করে। এ সকল উপকরনের পাশাপাশি অডিও রেকর্ডের জন্য শটগান মাইক্রোফোন ব্যবহার করা উচিত। এই মাইক্রোফোনটি এভাবে তৈরী যে পাশ থেকে কিংবা পেছন থেকে এটি কোন শব্দ গ্রহণ করে না ফলে আপনি যা বলবেন সেটি মাইক্রোফোন গ্রহণ করবে। কেউ কেউ একের অধিক মাইক্রোফোন ব্যবহার করে অতি সূক্ষ্ম শব্দও যোগ করে থাকে।

৩. অনুপ্রেরণা খুঁজে নিন

ভিডিওর বিষয়বস্তু বাছাই করা সকল ইউটিউবারদের জন্য একপর্যায়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কেননা যারা আপনার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করেছে তারা সবসময় নতুন কিছু চায়। নিজের সৃজনশীলতার সাথে দর্শকের চাহিদা সর্বদা সমাবস্থায় থাকবে এমনটি নয়। তবে ঘাবড়ে না গিয়ে আপনার অন্তরদৃষ্টিকে প্রসারিত করুন। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে নানা অনুপ্রেরণাদায়ক উপাদান। নিজেকে গুছিয়ে নিন এবং আপনার আইডিয়াগুলোকে একটি খাতায় লিখে রাখুন। বিষয়বস্তুর পাশাপাশি নিজের স্টাইলটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিন। এটি হতে পারে আপনার উপস্থাপনার ধরন, সম্পাদনার স্টাইল কিংবা নতুন কোনো চিত্রগ্রহণের কৌশল।

৪. প্রতিটি সেকেন্ডের মর্যাদা দিন

দর্শক তার মূল্যবান সময়ের বিনিময়ে আপনার তৈরি করা ভিডিওটি দেখে। সুতরাং অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয়ে সময় নষ্ট তারা করবে না এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে ভিডিও সম্পাদনা করে ভিডিও হতে কম প্রয়োজনীয় অংশগুলো ছাটাই করে দিতে হয়। পরিশেষে ভিডিওটি আপলোডের পূর্বে তা দর্শকের দৃষ্টি দিয়ে একবার দেখে নেওয়া উচিত। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি একজন দর্শক হলে এই ভিডিওটি সম্পূর্ণ দেখতেন?

৫. সাধারণ সফটওয়্যার দিয়ে সম্পাদনা করুন

ভিডিও সম্পাদনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভিডিও ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রে। তাই বলে ‘ফাইনাল কাট প্র’য়ের মতো জটিল কোনো সফটওয়্যার দিয়ে যে ভিডিও সম্পাদনা করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। উল্টো অনেকেই সহজ ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার ব্যবহার করতে বলে থাকে। এতে অহেতুক সময়ের অপচয় হয় না। যারা ভিডিও এডিটিংয়ে নতুন তারা উইন্ডোজ মুভি মেকার অথবা অ্যাপেল আই-মুভির মতো বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যারগুলোর সাহায্যে সম্পাদন করতে পারেন। এগুলো ব্যবহারকারীবান্ধব এবং কোনো টাকা খরচ না করে ডাউনলোড করা যায়।

চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবার বাড়লে, আপনার উপার্জনও বাড়বে; ইমেজ সোর্স: shoutmeloud.com

৬. নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন

ইউটিউবকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গণ্য না করা হলেও ইউটিউবারদের মাঝে যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন তাদের নিজস্ব সুবিধার জন্য। কেননা দেখা গিয়েছে বিভিন্ন ইউটিউবাররা একত্রে  একটি ভিডিও বানালে সেটির প্রতি দর্শকদের আলাদা আগ্রহ থাকে। এছাড়া ভিন্ন দুজন ইউটিউবার একটি ভিডিও তৈরি করলে তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা তুলনামূলক বেড়ে যায়, পরিচিতি বাড়ে। তাই নতুন ইউটিউবারেরা বিখ্যাত ইউটিউবারদের সহযোগিতা চাইতে পারেন। প্রথমে কিছুটা অস্বস্তিবোধ হলেও চেষ্টা করে যেতে হবে।

৭. দর্শকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন

কোনো চ্যানেল খোলার সাথে সাথেই আপনার অনুসারী সংখ্যা বেড়ে যাবে না। এটি হয় ধীরে ধীরে। আপনার ভিডিও সংখ্যা যত বাড়বে ততই দর্শকদের আপনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা বাড়তে থাকবে এবং আপনার ভিডিওতে  দর্শকেরা মন্তব্য করা শুরু করবে। তাই দর্শকদের সন্তুষ্ট রাখা আপনার দায়িত্ব। দর্শকদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং একই সাথে তাদের মেইলের জবাব দিতেও হেলা করলে চলবে না। তাদের সাথে যত-সম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

মনে রাখতে হবে আপনার অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ সাইটের একাউন্ট আপনার চ্যানেলের প্রসারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। তাই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টুইটারে নিজের জীবনের টুকরো অংশগুলো তুলে ধরতে পারেন। কেননা দর্শকের মাঝে গুরুভাগের আগ্রহ থাকে আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে ঘিরে। ফলে তারা আপনার সাথে আরও সহজে যুক্ত হতে পারবে। এর একটি সুবিধা হলো অনেক সময় দর্শকেরাও অনেক ভালো ভিডিও কনটেন্টের আইডিয়া দিতে পারে। এছাড়া দর্শকদের কাছ থেকে যে ভালবাসা এবং অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় তা আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করবে।

আপনি ইউটিউব জগতের তুখোড় ইউটিউবার হন কিংবা সদ্য চ্যানেল খোলা নবীন ইউটিউবার, নেতিবাচক মন্তব্যের আপনাকে সম্মুখীন হতে হবেই। জ্ঞানী ব্যক্তির মত এই যে এসব নেতিবাচক মন্তব্যে সময় ব্যয় না করে একটু ঘুমিয়ে নিন। এতে মন এবং স্বাস্থ্য উভয়ই ভালো থাকবে। আমাদের এ জগত বিচিত্র মানুষে ঠাসা। আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নিজের পরিচয় না দিয়ে দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যায়। এসব কারণে মূলত কোনো ইতিবাচক ভিডিওতেও নেতিবাচক মন্তব্য হয়ে থাকে। আপনাকে মনে রাখতে হবে যে আপনি সকলের মন যুগিয়ে চলতে পারবেন না। ফলে অবধারিতভাবেই অসংখ্য নেতিবাচক মন্তব্য আপনার চোখের সামনে ঘোরাফেরা করবে। এসব দেখে নিরাশ না হয়ে ইতিবাচক মন্তব্য গুলো থেকে প্রেরণা নিন।

ফিচার ছবি- mnhemant.com

সোশ্যাল মিডিয়াতে ‘বেচাকেনাবিহীন’ ব্যবসার আদ্যোপান্ত

কিভাবে একজন সফল অনলাইন ফিটনেস কোচ হবেন